নীলফামারী VPAP পোর্টালে স্বাগতম

রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে প্রায় ৪০০ কিঃমিঃ দুরে ১৬৪৩.৪০-বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এ জেলার অবস্থান,যা কর্কটক্রান্তি রেখার সামান্য উত্তরে অবস্থিত। এ জেলার পূর্বে রংপুর ও লালমনির হাট, দক্ষিণে রংপুর ও দিনাজপুর,পশ্চিমে দিনাজপুর ও পঞ্চগড় এবং উত্তরে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলা । কৃষি নির্ভর এ জেলার ৯০% সহজ সরল মানুষ কোন না কোন ভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। নীলফামারীর দীগন্ত বিস্তৃত সমতল ভূমিতে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ধান, গম, আলু, তামাক এবং আরও বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপন্ন হয়। ভাওয়াইয়া গানের সুতিকাগার এ জেলায় আব্বাস উদ্দিন , হরলাল রায়, রথীন্দ্রনাথ রায় এর জম্ম। এ জেলায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা সেচ প্রকল্প সেচ ও সম্পুরক সেচ সুবিধা দিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভুমিকা রাখছে। জেলার উত্তর পূর্বদিক দিয়ে বহমান তিস্তা নদী জেলার দু’টি উপজেলার (ডিমলা-জলঢাকা) জন্য এখনও অভিশাপ হিসেবে বিদ্যমান। বৃহত্তর রংপুর দিনাজপুরের কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থিত এ জেলার সৈয়দপুর এর ক্ষুদ্র শিল্প গোটা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা সৈয়দপুরে অবস্থিত। উত্তরা ইপিজেড এলাকার কর্মসংস্থানে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। নীলসাগর নামীয় বিশাল দিঘী এলাকার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। সম্প্রতি চালুকৃত নীলসাগর আন্তঃনগর এক্মপ্রেস ট্রেন যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ।

দুই শতাধিক বছর পূর্বে এ অঞ্চলে নীল চাষের খামার স্থাপন করে ইংরেজ নীলকরেরা। এ অঞ্চলের উর্বর ভূমি নীল চাষের অনুকূল হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় নীলফামারীতে বেশি সংখ্যায় নীলকুঠি ও নীল খামার গড়ে ওঠে। ঊণবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই দুরাকুটি, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, টেঙ্গনমারী প্রভৃতি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়।

সে সময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মধ্যে নীলফামারীতেই বেশি পরিমাণে শস্য উৎপাদিত হতো এখানকার উর্বর মাটির গুণে। সে কারণেই নীলকরদের ব্যাপক আগমন ঘটে এতদঅঞ্চলে। গড়ে ওঠে অসংখ্য নীল খামার। বর্তমান নীলফামারী শহরের তিন কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন রেল স্টেশনের কাছেই ছিল একটি বড় নীলকুঠি। তাছাড়া বর্তমানে অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত পুরাতন বাড়িটি ছিল একটি নীলকুঠি।ধারণা করা হয়, স্থানীয় কৃষকদের মুখে ‘নীল খামার’ রূপান্তরিত হয় ‘নীল খামারী’তে। আর এই নীলখামারীর অপভ্রংশ হিসেবে উদ্ভব হয় নীলফামারী নামের।

নীলফামারী জেলা (রংপুর বিভাগ)  আয়তন: ১৫৮০.৮৫ বর্গ কিমি। অবস্থান: ২৫°৪৪´ থেকে ২৬°১৯´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°৪৪´ থেকে ৮৯°১২´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। সীমানা: উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে রংপুর জেলা, পূর্বে লালমনিরহাট জেলা, পশ্চিমে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা।

জনসংখ্যা  ১৫৭১৬৯০; পুরুষ ৮১০২৬৮, মহিলা ৭৬১৪২২। মুসলিম ১৩১১৯১৪, হিন্দু ২৫৭৬৩৫, বৌদ্ধ ৮৭৭, খ্রিস্টান ১৫৫ এবং অন্যান্য ১১০৯। এ উপজেলায় সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।

জলাশয়  প্রধান নদী: তিস্তা, যমুনেশ্বরী, বুড়ি তিস্তা, ঘাঘট ।

প্রশাসন  ১৮৭৫ সালে মহকুমা গঠিত হয় এবং মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৪ সালে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলা সর্ববৃহৎ (৩৭৩.০৯ বর্গ কিমি) এবং সবচেয়ে ছোট উপজেলা সৈয়দপুর (১২১.৬৮ বর্গ কিমি)।

জেলা

আয়তন(বর্গ কিমি)

উপজেলা

পৌরসভা

ইউনিয়ন

মৌজা

গ্রাম

জনসংখ্যা

ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কিমি)

শিক্ষার হার (%)

শহর

গ্রাম

১৫৮০.৮৫

৬১

৩৭১

৩৭০

২৩৫৮৩৯

১৩৩৫৮৫১

৯৯৪

৯৮.৮

 

জেলার অন্যান্য তথ্য

উপজেলা নাম

আয়তন (বর্গ কিমি)

পৌরসভা

ইউনিয়ন

মৌজা

গ্রাম

জনসংখ্যা

ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কিমি)

শিক্ষার হার (%)


কিশোরগঞ্জ

২০৪.৯০

-

৫১

৫৩

২৫৩১৯২

১২৩৬

৩২.৭


জলঢাকা

৩০৩.৫২

-

১২

৬৯

৬৯

২৭৪৭৩৬

৯০৫

৩৩.০


ডিমলা

৩২৬.৮০

-

১০

৫৩

৫৩

২২৩৯৭৫

৬৮৫

৩৬.২


ডোমার

২৫০.৮৪

১০

৪৭

৪৭

২১৫৬৯৯

৮৬০

৪৪.৭


নীলফামারী সদর

৩৭৩.০৯

১৫

১০৯

১০৮

৩৭১৮৭৯

৯৯৭

৩৯.২


সৈয়দপুর

১২১.৬৮

৪২

৪০

২৩২২০৯

১৯০৮

৪৮.৫


সূত্র  আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি   ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ অবাঙালিদের (বিহারি) হামলায় সৈয়দপুর উপজেলার বেশ কয়েকজন নিরীহ বাঙালি প্রাণ হারায়। ৭ এপ্রিল পাকসেনারা এ উপজেলায়  বাঙালিদের ওপর নির্যাতন চালায় ও হত্যা করে। ৮ এপ্রিল পাকসেনারা নীলফামারী জেলা শহরের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়। মে মাসে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ কুন্ডুকে ধরে নিয়ে ৮ দিন আটক রাখার পর হত্যা করে। ২৩ জুন  সৈয়দপুরের গোলাহাটে পাকসেনারা ৩৫০ জন নিরীহ বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করে। ১১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের মোস্তাফিজুর রহমানকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৬ ডিসেম্বর জলঢাকা পাকসেনা মুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন  বধ্যভূমি ১ (গোলাহাট), গণকবর ৮, স্মৃতিস্তম্ভ ২ (সদর উপজেলার স্বাধীনতার স্মৃতি অম্লান ও বাশার গেট), ভাস্কর্য ১। এছাড়া তেভাগা আন্দোলনে নিহত তৎনারায়ণের স্মরণে ডিমলা বাজারে ‘তৎনারায়ণ স্মৃতিস্তম্ভ’ স্থাপিত হয়েছে।

শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  গড় হার ৩৮.৮%; পুরুষ ৪৪.৭%, মহিলা ৩২.৬%। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: নীলফামারী সরকারি কলেজ (১৯৮৬), সৈয়দপুর মহাবিদ্যালয় (১৯৫৩), মশিউর  রহমান কলেজ  (১৯৫৮), সরকারি মহিলা কলেজ (১৯৭২), কিশোরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ (১৯৭২), জলঢাকা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় (১৯৭২), সৈয়দপুর মহিলা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় (১৯৮১), ডিমলা ইসলামী ডিগ্রি কলেজ (১৯৮৩), ডিমলা মহিলা বিদ্যালয় (১৯৯৮), নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৮২), সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৪), সৈয়দপুর  পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৬), খগা খড়িবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৬), খগা বড়বাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৭), নাউতারা আবেউননেছা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১১), নীলফামারী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৪), তুলশীরাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৪), ডিমলা রাণী বৃন্দারাণী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৭), ডোমার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৯), মাগুড়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৩), জলঢাকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৩৯), কিশোরগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৩৯), নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৪৫),  শিমুলবাড়ী এস সি উচ্চ বিদ্যালয়, গোলমুন্ডা ফাজিল মাদ্রাসা (১৯১৯)।

জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস  কৃষি ৬৮.৫১%, অকৃষি শ্রমিক ৩.৯৩%, শিল্প ০.৬৬%, ব্যবসা ১১.৭৭%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ৩.০৬%, নির্মাণ ০.৮৯%, ধর্মীয় সেবা ০.২৩%, চাকরি ৫.৯৩%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ০.১৭% এবং অন্যান্য ৪.৮৫%।

পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী  দৈনিক: নীল কথা; সাপ্তাহিক: নীলফামারী বার্তা, নীলসাগর, নীলসমাচার, জলঢাকা, আলপনা সৈয়দপুর বার্তা, জনসমস্যা, মানবসমস্যা, দাগ; মাসিক: তৃণ, অতন্দ্র; ত্রৈমাসিক: দিগন্ত; অবলুপ্ত: জাগরী (১৯৬২), নীলাঞ্চল (১৯৭২), শালকী, জলতরঙ্গ, পল্লব।

লোকসংস্কৃতি  এ জেলায়  ভাওয়াইয়া গানের বিশেষ প্রচলন রয়েছে। প্রচলিত গানগুলো কাহিনী প্রধান। বিষহরি বা মনসার গান, হুদুমদেওর গান, মহররমের জারি, বিয়ের গান বা হেরোয়া, ভাসান যাত্রা, সত্যপীরের গান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নয়নশরি-বোষ্টম বাউদিয়া, শীতল শরি-জানকপালা, অম্বলশরি-পিছল বাউদিয়া, পয়মাল শরি-ভোদাইমেম্বার প্রভৃতি ‘শরির গান’ বেশ জনপ্রিয়। তিনদিন থেকে ছয় দিনের নবজাতককে ঘিরে আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশীরা ‘পাসটি’ নামের একটি উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এছাড়া এ জেলায় অষ্টমঙ্গলা, ভাদরকাটানী, পৌষকাটানী প্রভৃতি সামাজিক-সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রচলন রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা  নীলসাগর দীঘি এবং উত্তরা ইপিজেড ও তিস্তা ব্যারেজ।  [আবদুস সাত্তার]

আরও দেখুন সংশ্লিষ্ট উপজেলা।

তথ্যসূত্র  আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; নীলফামারী জেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭।

যোগাযোগ

  • Deputy Comissioner Office, Nilphamari

hotline

01712931626